Friday, March 18, 2016

আব্দুল লতিফ ফুলতলী

আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী

জন্ম ও বংশ পরিচয়
আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ১৩২১ বাংলার ফাল্গুন মাসে অর্থাৎ ১৯১৩ সালের প্রথম দিকে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ফুলতলী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।তার পিতার নাম মুফতি আব্দুল মজিদ। তিনি হযরত শাহ জালাল রহ. এর সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ কামাল রহ. এর বংশধর ছিলেন।আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী রহ. ছিলেন একজন সুপরিচিত আলেমে দ্বীন, তরীকতের মুর্শিদ এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারী বিশিষ্ট বুযুর্গ

বাল্য জীবন
আল্লামা ছাহেব কিবলা (রহ.) এর বাল্য জীবন এবং কৈশোর জীবন ছিল বেদনাভরা জীবন। স্নেহময়ী মাতা শৈশবকালেই বিদায় নেন। তাঁর কৈশোর জীবনে পদার্পণের আগেই বুযুর্গ পিতা ইহলোক ত্যাগ করেন। বাল্যকালে শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতাকে হারিয়ে ছাহেব কিবলা (রহ.) পিছিয়ে পড়েন নাই। শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং গোটা বিশ্বের মানুষের দোরগোড়ায় ইসলাম প্রচারের বিশাল এক মিশন সফল করার জন্য বাল্যকাল থেকে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের জ্ঞানের ভাণ্ডারে ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য, পথহারা বিশ্বের মানুষকে পথ দেখানোর জন্য তিনি খালিস নিয়তে অজিফা আমল সহকারে কোরআন ও হাদিসের অতল সাগরে ডুবুরী সেজে মণি-মুক্তা আহরণে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর বাল্যকালটি ছিল জ্ঞানের ভাণ্ডার পূরণের কাল এবং ইলমে মারিফাত ও তাছাউফে নিমগ্ন হওয়ার প্রাথমিক কাল।



শিক্ষাজীবন
শিক্ষাজীবনের প্রারম্ভে তিনি তার চাচাতো ভাই ফাতির আলীর নিকট লেখা পড়া করেন। অতঃপর ফুলতলী মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে তিনি বদরপুর সিনিয়র মাদ্রাসায় উচ্চ মাধ্যমিত শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর রামপুর আলিয়া ও মাতলাউল উলুম মাদ্রাসায় হাদীস শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। ১৩৫৫ হিজরীতে তিনি মাতলাউল উলুম মাদ্রাসায় ১ম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে হাদীস শরীফের সর্বোচ্চ সনদ অর্জন করেন। তার গুরুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আল্লামা খলিলুল্লাহ রামপুরী ও আল্লামা ওয়াজিহুদ্দীন রামপুরী রহ.।এ ছাড়া তিনি শাহ আব্দুর রউফ করমপুরী রহ. ও শায়খুল কুররা আহমদ হেজাযী রহ. এর নিকট থেকে ইলমে কিরাতের সনদ অর্জন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি শায়খুল কূররার নিকট থেকে ইলমে কিরাতের সর্বোচ্চ সনদ অর্জন করেন।

ইলমে হাদিস, তফসির ও ফিক্হের জ্ঞানার্জন
তিনি ভারতের সেকালের সুন্নী দ্বীনি মাদরাসা ‘রামপুর আলিয়া মাদরাসায়’ ভর্তি হয়ে ইলমে হাদিসের গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য সেথায় গমন করেন।১৯৫৫ সালে ছাহেব কিবলা (রহ.) ‘মাতলাউল উলুম’ মাদরাসায় হাদিসের সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন প্রখ্যাত মোহাদ্দিস খলিলুল্লাহ রামপুরী (রহ.) এবং মাওলানা অজিউদ্দিন রামপুরী (রহ.) এর নিকট হাদিসের সনদ লাভে ধন্য হন।আল্লামা ছাহেব কিবলা (রহ.) দেশের সাধারণ আলেমদের রীতিনীতির উপর প্রথমে ইলমে হাদিসের সর্বোচ্চ সনদ লাভের পর তিনি বিশ্বনন্দিত মহাগ্রন্থ আল কোরআনের তফসির বিষয়ক গভীর জ্ঞান আহরণের জন্য ভারত বর্ষের ধর্মীয় বিদ্যাপীঠগুলোতে চষে বেড়ান। শুধু ভারতের রামপুর আলিয়াতেই নয়, করমপুর এবং বদরপুরেও ইলমে তফসিরে তিনি আল কোরআনের উপরে অতুলনীয় জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হন। তিনি আল কোরআনের উপরে যুগোপযোগী তফসির ‘আত্ তানভীর আলাত তাফসির’ লিপিবদ্ধ করে গভীর সমুদ্রে পড়ে থাকা জ্ঞানভাণ্ডারকে জনসমক্ষে তুলে ধরেন। জ্ঞান সমুদ্রের এই সঞ্চিত ভাণ্ডার এবং ছাহেব কিবলা (রহ.) এর অসংখ্য মাহফিলের তফসির তাঁকে রইসুল মুফাসসিরীনের সম্মানীয় আসন অলংকৃত করার সৌভাগ্য দান করে।

আকাইদ এবং আখলাক বিষয়ক জ্ঞান অর্জন
ঈমানের মূল স্তম্ভ হলো আকাইদ। আকাইদ ছাড়া ঈমান, যেমন পোশাক ছাড়া মানুষ। আকীদা হলো ঈমানের ভূষণ। আকীদা ব্যতিত মূল ঈমান এবং নেক আমল সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। আল্লামা ছাহেব কিবলাহ (রহ.) তার অর্জিত বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মূল ধারায় বাংলাদেশ, পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতসহ আমেরিকা, ইংল্যান্ড এবং ইউরোপের সর্বত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করে বিশ্ব মুসলিমকে মুক্তির দিশা দিয়েছেন। তিনি আকীদার উপরে অত্যন্ত শক্তিশালী পুস্তক ‘ফারাইদ ফিল আকাইদ’ রচনা করেন।

ইলমে তাসাউফ ও ছাহেব কিবলাহ (রহ.)
ইলমে জাহির ও ইলমে বাতিনের সমন্বিত রূপ হলো ইলমে তাসাউফ। ইসলাম ধর্মের সারাংশ হলো এই ইলমে তাসাউফ। যা ছাড়া মারেফতে ইলাহী, ইশকে রাসূল এবং ইবাদতের স্বাদ অর্জন করা আদৌ সম্ভব নয়। ইমাম মালেক (রহ.) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি নিজের মধ্যে ইলমে শরীয়ত এবং ইলমে মারিফাত একত্রিত করলো সে প্রকৃত ঈমানদার। অন্যথায় সে জিন্দিক বা ফাসেক।

আল্লামা ছাহেব কিবলা (রহ.) ছিলেন ইলমে জাহির এবং ইলমে বাতিনের মিলন মোহনা। আল্লাহর প্রতি পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য সৃষ্টির পাশাপাশি আধ্যাত্মিকভাবে তিনি আল্লাহর এতই কাছের বন্ধু ছিলেন যে, যখন তিনি ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতেন তখন দুনিয়ার সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে যেতেন। তিনি যেন তাঁর মহান প্রভুর সাথে মিলিত হচ্ছেন । হাদিস শরীফে এসেছে

‘তুমি আল্লাহর এবাদত কর এমনভাবে যেন তুমি তাকে দেখতে পাচ্ছ, আর যদি তুমি তাকে দেখতে না পাও তবে এতটুকু তোমার মনে রাখতে হবে যে, তিনি তোমাকে দেখছেন।’

কর্মজীবন
১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনি বদরপুর আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৪ সাল থেকে গাছবাড়ী জামেউল উলুম মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করেন। এ সময় মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষঅধ্যক্ষের দায়িত্ব পলন করেন। এরপর সৎপুর, ইছামতি ও বাদেদেওরাইল ফুলতলী আলিয়া মাদ্রাসায় হাদীস শাস্ত্র অধ্যাপনা করেন। এ ছাড়া তিনি শুদ্ধভাবে কোরআন তিলাওয়াত শিক্ষাদানের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাষ্ট। দেশ বিদেশে প্রতিষ্ঠা করেন অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।

তরীকত
 
আল্লামা ফুলতলী রহ. ছিলেন তরীকায়ে কাদেরিয়া, চিশতীয়া, নক্সবন্দীয়া, মুজাদ্দেদিয়া ও মুহাম্মদিয়ার মহান মুর্শিদ। তিনি আজীবন উপরোক্ত তরীকা সমূহের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর তরিকতের সিলিসিলা নিম্নরূপঃ
1. শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী রহ.
2. শাহ ইয়া’কুব বদরপুরী রহ.
3. হাফিজ আহমদ জৌনপুরী রহ.
4. কারামত আলী জৌনপুরী রহ.
5. সাইয়েদ আহমাদ ব্রেলভী রহ.
6. শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ.
7. শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ.
 
ইন্তেকাল
আল্লামা ফুলতলী রহ. ১৬ জানুয়ারি, ২০০৮ সালে সিলেট শহরে ইন্তেকাল করেন।
 
উত্তরসূরী
আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরীর ইন্তেকালের পর তাঁর অনুসারীরা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মনোনীত করেছেন তাঁর বড় ছেলে আল্লামা ইমাদ উদ্দীন চৌধুরীকে। আল্লামা ইমাদ উদ্দীন প্রাথমিক জীবনে শিক্ষকতা করতেন। ১৯৭৮ সালে সৎপুর কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ থাকাকালে চাকুরী ছেড়ে স্থায়ীভাবে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। এরপর অবৈতনিকভাবে ইছামতি কামিল মাদ্রাসা ও পরে বাদেদেওরাইল কামিল মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করেন। পিতার ইন্তেকালের পর থেকে তিনি পিতার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ভক্ত ও অনুসারীদেরকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিবেন।

রচনাবলী
· আত তানভীর আলাত তাফসীর
· মুন্তাখাবুস সিয়র
· আনওয়ারুছ ছালিকীন
· আল খুতবাতুল ইয়াকুবিয়া
· নালায়ে কলন্দর
· শাজরায়ে তাইয়্যিবাহ
· আল কাউলুছ ছাদীদ।
 
তার লেখা অনেক উর্দু ও আরবি গ্রন্থ ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে রয়েছে। এ ছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের পাঠ্যসূচিতেও তার অনেক গ্রন্থ রয়েছে।

সংগঠন ও প্রতিষ্ঠা
তিনি কোরআনকে প্রত্যেকের ঘরে ঘরে পাঠের ব্যবস্থা হিসাবে ‘দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট’ নামে ইলমে কিরাত শিক্ষার আয়োজন করেন। যার ফলশ্রুতিতে আজ শুধু বাংলাদেশেই নয় বরং সারাবিশ্ব তথা ইউরোপ, আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেনের সর্বত্র দারুল কিরাতের আওয়াজ শুনা যায়।এছাড়াও তাঁর প্রতিষ্ঠিত অন্যন্য সংগঠন গুলো হলো-

· বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ
· বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামীয়া
· দারুল হাদীস লতিফিয়া, ইউ. কে
· লতিফিয়া ক্বারী সোসাইটি
· দারুল হাদীস লতিফিয়াহ
 
রাজনৈতিক জীবন
১ জমিয়তে উলামায়ে হিন্দে যোগদান
২ আসাম গর্ভমেন্ট এর বিরোধীতা
৩ নেজামে ইসলামে যোগদান
৪ আনজুমানে আল ইসলাহ গঠন
৫ কারাবরণ
৬ আনজুমানে তালামীযে ইসলামিয়া গঠন
৭ সুন্নিয়াতকে কায়েমের জন্য জীবন বাজি
৮ নাস্তিক মুরতাদ বিরোধী আন্দোলন
৯ রাষ্ট্রীয়ভাবে ফতুয়া বন্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন
১০ বাবরী মসজিদের ভাঙ্গার প্রতিবাদে আন্দোলন
১১ শাহজালালের দরগায় বোমা বিস্ফোরণের প্রতিবাদ
১২ ঐতিহাসিক লংমার্চ
১৩ আলেমদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় ছাহেব কিবলা (রহ.) এর ভূমিকা












No comments: