বেগম খালেদা জিয়া
আশির দশকের শুরুতে দেশে সামরিক শাসনের প্রভাব ছিল। তৎকালীন শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আন্দোলনে নামে। বেগম খালেদা জিয়া সেই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনসভা ও আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দাবিতে সোচ্চার হন। এ সময় তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক বাধার মুখোমুখি হন।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অন্যতম প্রধান নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক ধারার নতুন পথ তৈরি হয়।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। তাঁর নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তাঁর সরকারের সময়ে শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বেগম খালেদা জিয়া দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর সময়ে নারী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়।
১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্নে দেশব্যাপী আন্দোলন সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে এবং বেগম খালেদা জিয়া বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হলে তিনি আবারও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর সরকার অর্থনীতি, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও সামাজিক খাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরপর বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। গণতন্ত্র, নির্বাচন ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি বড় দিক হলো প্রতিকূলতার মধ্যেও নেতৃত্ব ধরে রাখা। রাজনৈতিক মামলা, কারাবরণ, দলীয় সংকট—সবকিছুর মধ্যেও তিনি তাঁর দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, তিনি গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি বলেই তিনি “আপোসহীন নেত্রী” নামে পরিচিত।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শেষ কয়েক দশক নানা আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি করে।এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত মামলা ছিল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা।১৯৯১ সালে এতিমখানা করার প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ১৯৯২ সালে কুয়েত ও সৌদি আরব থেকে এতিমখানার নামে টাকা আসে যার ২ কোটি ১০ লক্ষ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।২০০৮ সালের ৩ জুলাই দুদক বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় রমনা থানার অধীনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তার বড় ছেলে জনাব তারেক রহমান সহ মোট ছয় জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়।মামলার আসামীরা হলো বেগম খালেদা জিয়া, জনাব তারেক রহমান,সলিমুল হক,শরফুদ্দীন আহমেদ এবং মমিনুর রহমান। ৫ আগস্ট ২০০৯ অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় এবং ১৯ মার্চ ২০১৪ অভিযোগ গঠন করা হয়। বেগম খালেদা জিয়ার অনাস্থার কারনে মোট ৫ বার বিচারক বদল করা হয়।৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ নিন্ম আদালতে এই মামলার রায় প্রদান করে তৎকালিন ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার।এতে বেগম খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয় এবং অন্য আসামীদের ১০ বছরের কারাদণ্ড সহ প্রত্যেকের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা জরিমানা করা হয়।ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড.আখতারুজ্জামান আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।এই রায়ের ফলে সংবিধানের ৬৬(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আসামীরা বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।তবে আপিল বিভাগ মামলার কার্য়ক্রম স্থগিত বা বাতিল করলে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।রায়ের বিরুদ্ধে ২০ ফেব্রুয়ারী হাইকোর্টে আপিল করা হয়। ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট আপোসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাজা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করেছিল।২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতায় তার সাজা সাময়িকভাবে মওকুফ করা হলেও,পরবর্তীতে তিনি আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে খালাস লাভ করেন এবং ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি আপিল বিভাগ বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তামান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানসহ অন্যান্য আসামিদের এই মামলা থেকে খালাস দেন। আদালত পর্যবেক্ষণে জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে এই মামলাটি প্রতিহিংসামূলকভাবে দায়ের করা হয়েছিল।
২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হন।রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিরোধী মত দমন করার একটি কৌশল হিসেবে তাকে গ্রেফতার করা হলেও তৎকালীন সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়গুলোকে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তুলে ধরে।কারাবন্দি অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। তাঁর পরিবার ও দল বারবার উন্নত চিকিৎসার দাবি জানায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চাপ, বয়সজনিত সমস্যা ও অসুস্থতার কারণে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ, অসুস্থতা ও নানা প্রতিকূলতার পথ পেরিয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়। একজন নারী হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়া, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং দীর্ঘদিন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাঁর প্রয়াণ ছিল বাংলাদেশীদের জাতীয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ।
তাঁর নামাজে জানাজায় লক্ষাধিক মানুষ অংশ নেন এবং পরবর্তীতে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকার শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়। তাঁর বিদায়ে সমর্থক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগের অবসান হয়। তাঁর জীবন যেমন ছিল সংগ্রামের, তেমনি ছিল নেতৃত্ব, সাহস ও রাজনৈতিক প্রভাবের এক দীর্ঘ অধ্যায়।

No comments:
Post a Comment