Monday, July 6, 2026

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭



বাজেট ২০২৬-২০২৭

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো জাতীয় বাজেট। এটি মূলত সরকারের একটি বার্ষিক আর্থিক পরিকল্পনা, যেখানে একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে সরকারের সম্ভাব্য আয়, ব্যয়, উন্নয়ন কর্মসূচি, করনীতি এবং অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহ নির্ধারণ করা হয়। বাজেটের মাধ্যমে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কোন খাতে কত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে, কীভাবে রাজস্ব আহরণ করা হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা হবে। তাই জাতীয় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি দেশের উন্নয়নের রূপরেখা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা।


জাতীয় বাজেটের প্রধান উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়ন। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারের পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য। একটি বাস্তবসম্মত ও সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত বাজেট দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।



স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন, প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যেই সেই প্রথম বাজেট প্রণীত হয়। এরপর থেকে প্রতি অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের ঐতিহ্য বজায় রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অর্থনীতি যেমন প্রসারিত হয়েছে, তেমনি বাজেটের আকার, পরিধি এবং উন্নয়ন পরিকল্পনাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।


বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নের ইতিহাসে কয়েকজন অর্থমন্ত্রী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম তিনটি বাজেট উপস্থাপন করেন এবং নবগঠিত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে এম. সাইফুর রহমান টানা ও বিভিন্ন মেয়াদ মিলিয়ে মোট ১২ বার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করে দেশের বাজেট ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি অর্থমন্ত্রী হিসেবে স্থান করে নেন। একইভাবে আবুল মাল আবদুল মুহিতও ২০০৯–১০ থেকে ২০২০–২১ অর্থবছর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ১২টি জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন, যা বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং এবং এটি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী-এর প্রথম বাজেট যা বর্তমান সরকারের নতুন অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও নীতিগত দিকনির্দেশনার প্রতিফলন।৩০ জুন ২০২৬ জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ৫৫ তম জাতীয় বাজেট কণ্ঠভোটে পাস হয়। সংবিধান অনুযায়ী, অনুমোদিত এই বাজেট ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয় এবং ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত এর কার্যকারিতা বহাল থাকবে।


২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, কারণ এটি এমন এক সময়ে প্রণীত হয়েছে যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। একই সঙ্গে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং বৈষম্য হ্রাসের বিষয়গুলোও এই বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাই এই বাজেট শুধু বর্তমান অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা নয়; বরং আগামী দিনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট। ২০২৬ সালের ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বাজেট উপস্থাপন করেন। এটি বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট এবং দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট। "গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা"—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রণীত বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন।


২০২৬–২৭ অর্থবছরের  বাজেটের মোট আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই বাজেট দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩.৭ শতাংশ। আগের অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রতি অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।


সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, আর বাকি ৯১ হাজার কোটি টাকা আসবে কর-বহির্ভূত উৎস ও অন্যান্য আয় থেকে। রাজস্ব আহরণের এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের জন্য কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, করের আওতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


বাজেটে মোট ব্যয়ের মধ্যে উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ, জ্বালানি এবং স্থানীয় সরকার খাতের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। অন্যদিকে পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা, যা সরকারি প্রশাসন পরিচালনা, বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং বিভিন্ন নিয়মিত ব্যয়ে ব্যবহৃত হবে।


২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ৩.৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা করেছে। ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে বৈদেশিক ঋণের অংশ তুলনামূলকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনাও বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে।


সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য উৎপাদন বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, রপ্তানি সম্প্রসারণ, আর্থিক খাতে সংস্কার এবং বাজার ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।


এই বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, স্থানীয় সরকার, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।


সব মিলিয়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট একটি উচ্চাভিলাষী ও সংস্কারমুখী বাজেট। একদিকে এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে এই বাজেটের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি, উন্নয়ন প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর।


২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং যোগাযোগ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪.৬ শতাংশ। এই অর্থ প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা এবং শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।

স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ৭.৪ শতাংশ। হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ সরবরাহ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে এই অর্থ ব্যয় হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৫.৪ শতাংশ। বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ভাতা ও সহায়তা কর্মসূচি এ খাতের আওতায় বাস্তবায়িত হবে।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ৪.৬ শতাংশ। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, ভর্তুকি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে।

যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ৬.৫ শতাংশ। সড়ক, সেতু, রেলপথ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার খাতে ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা (প্রায় ৪.৪ শতাংশ) এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা (প্রায় ১.৮ শতাংশ) বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এসব বরাদ্দের মাধ্যমে স্থানীয় উন্নয়ন, জনসেবা সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় বাজেটে কর ও শুল্ক নীতি সরকারের রাজস্ব আহরণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আয়কর হলো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর আরোপিত কর। ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) হলো কোনো পণ্য বা সেবা উৎপাদন, আমদানি, বিক্রয় বা সরবরাহের প্রতিটি ধাপে সংযোজিত মূল্যের ওপর আরোপিত কর। আর শুল্ক হলো বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি বা রপ্তানির ক্ষেত্রে আরোপিত কর, যা রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য বৃদ্ধি, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর এবং বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং উৎপাদনশীল খাতকে উৎসাহিত করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর ও শুল্ক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

ব্যক্তিশ্রেণির সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। নারী ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব করদাতাদের জন্য এই সীমা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের জন্য ৫ লাখ টাকা এবং গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সারা বছর অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালু করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই রিটার্ন দাখিল করলে কর রেয়াতের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাল, গম, ডাল, ভোজ্যতেল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদিসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের অগ্রিম কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট এবং চোখের লেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সামগ্রীর আমদানি পর্যায়ে কর ও ভ্যাটে ছাড় দেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমে।

অন্যদিকে তামাকজাত পণ্য ও কিছু বিলাসবহুল পণ্যের ওপর কর ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পের কাঁচামাল, উৎপাদনমুখী যন্ত্রপাতি এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু পণ্যে শুল্ক যৌক্তিক করা হয়েছে, যাতে দেশীয় শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

জাতীয় বাজেট শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা নয়; এটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনকে প্রভাবিত করে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটেও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে রাজস্ব, ব্যয় ও উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় ধরনের প্রভাবই সাধারণ মানুষের জীবনে পড়বে।

চাকরিজীবীদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক করদাতার করের বোঝা কিছুটা কমবে। পাশাপাশি ডিজিটাল করসেবা চালুর ফলে কর প্রদান আরও সহজ ও স্বচ্ছ হবে।

কৃষকদের জন্য কৃষি ভর্তুকি, উন্নত বীজ, সেচ সুবিধা এবং কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহারে উৎসাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য শিল্পের কাঁচামাল ও উৎপাদনমুখী যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক যৌক্তিক করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে কর প্রশাসনের ডিজিটাল সংস্কার ব্যবসা পরিচালনাকে আরও সহজ করবে।

শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হবে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য ও মানসম্মত করতে ভূমিকা রাখবে।

তবে বাজেটের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে বিলাসবহুল ও তামাকজাত পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এছাড়া বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকলে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের দামও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বাজার তদারকি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই ভিত্তির ওপর এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা। এই বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো ও স্থানীয় সরকার খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

তবে একটি বাজেটের সফলতা শুধু বড় বরাদ্দ বা উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ওপর নির্ভর করে না; এর সফলতা নির্ভর করে সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করা, অপচয় ও দুর্নীতি রোধ, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

আগামী দিনে করব্যবস্থার আরও আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাজেটের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর নীতি গ্রহণ দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে সহায়ক হবে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। সরকারের পরিকল্পনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে এই বাজেট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক উন্নয়ন এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক অবদান রাখবে। তবে এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে সরকার, বেসরকারি খাত এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর।

এক নজরে বাজেট ২০২৬–২০২৭

  • অর্থবছর: ১ জুলাই ২০২৬ – ৩০ জুন ২০২৭।
  • বাজেট উপস্থাপনের তারিখ: ১১ জুন ২০২৬।
  • জাতীয় সংসদে বাজেট পাস: ৩০ জুন ২০২৬।
  • বাজেট কার্যকর: ১ জুলাই ২০২৬।
  • এটি বাংলাদেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট।
  • বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
  • বাজেটের প্রতিপাদ্য: "গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা"।
  • মোট বাজেটের আকার: ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
  • বাজেটের আকার জিডিপির প্রায় ১৩.৭ শতাংশ।
  • মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য: ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
  • এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য: ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
  • কর-বহির্ভূত ও অন্যান্য আয়ের লক্ষ্য: ৯১ হাজার কোটি টাকা।
  • বাজেট ঘাটতি: ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
  • বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৩.৬ শতাংশ।
  • বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি): প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।
  • জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য: ৬.৫ শতাংশ।
  • মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য: ৭.৫ শতাংশ।
  • সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা: ৪ লাখ টাকা।
  • নারী ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা: ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
  • প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা: ৫ লাখ টাকা।
  • বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধার করমুক্ত আয়ের সীমা: ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
  • সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ: ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা (মোট বাজেটের প্রায় ১৫.৪ শতাংশ)।
  • শিক্ষা খাতে বরাদ্দ: ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা (প্রায় ১৪.৬ শতাংশ)।
  • স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ: ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা (প্রায় ৭.৪ শতাংশ)।
  • যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ: ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা (প্রায় ৬.৫ শতাংশ)।
  • কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ: ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা (প্রায় ৪.৬ শতাংশ)।
  • স্থানীয় সরকার খাতে বরাদ্দ: ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা (প্রায় ৪.৪ শতাংশ)।
  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ: ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা (প্রায় ১.৮ শতাংশ)।
  • নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় ৬০টি পণ্যে অগ্রিম কর কমানো হয়েছে।
  • কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট ও চোখের লেন্সে কর ও ভ্যাট ছাড় দেওয়া হয়েছে।
  • তামাকজাত ও কিছু বিলাসবহুল পণ্যের ওপর কর ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে।
  • শিল্পের কাঁচামাল ও উৎপাদনমুখী যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক যৌক্তিক করা হয়েছে।
  • অনলাইন আয়কর রিটার্ন দাখিল ও ডিজিটাল করসেবা আরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
  • বাজেটের মূল লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন।

অর্থনৈতিক পরিভাষার সহজ ব্যাখ্যা (Glossary)


  1. অর্থবছর (Fiscal Year): সরকারের আয়-ব্যয় এবং আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার নির্ধারিত এক বছরের সময়কাল। বাংলাদেশে অর্থবছর ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত।
  2. জাতীয় বাজেট (National Budget): একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরের জন্য সরকারের আয়, ব্যয় ও উন্নয়ন পরিকল্পনার বার্ষিক আর্থিক বিবরণী।
  3. রাজস্ব (Revenue): কর, ফি, শুল্ক ও অন্যান্য উৎস থেকে সরকারের অর্জিত মোট আয়।
  4. রাজস্ব ঘাটতি (Revenue Deficit): সরকারের রাজস্ব আয় দিয়ে রাজস্ব ব্যয় সম্পূর্ণ মেটানো সম্ভব না হলে যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়।
  5. বাজেট ঘাটতি (Budget Deficit): সরকারের মোট ব্যয় মোট আয়ের চেয়ে বেশি হলে যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়।
  6. জিডিপি (GDP): একটি দেশে নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত সব চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য। এর পূর্ণরূপ Gross Domestic Product।
  7. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (Economic Growth): একটি দেশের উৎপাদন, আয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির হার।
  8. মূল্যস্ফীতি (Inflation): সময়ের সঙ্গে পণ্য ও সেবার দাম ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা।
  9. রাজস্ব বোর্ড (NBR): জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, যা কর, ভ্যাট ও শুল্ক আদায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা।
  10. আয়কর (Income Tax): ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর সরকার কর্তৃক আরোপিত কর।
  11. ভ্যাট (VAT): পণ্য বা সেবার প্রতিটি ধাপে সংযোজিত মূল্যের ওপর আরোপিত কর। এর পূর্ণরূপ Value Added Tax।
  12. শুল্ক (Customs Duty): বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি বা বিদেশে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আরোপিত কর।
  13. সম্পূরক শুল্ক (Supplementary Duty): নির্দিষ্ট কিছু পণ্য বা সেবার ওপর ভ্যাটের অতিরিক্ত আরোপিত কর।
  14. করমুক্ত আয়ের সীমা (Tax-free Income Threshold): যে পরিমাণ আয় পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে আয়কর দিতে হয় না।
  15. এডিপি (ADP): বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (Annual Development Programme)। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বার্ষিক পরিকল্পনা।
  16. ভর্তুকি (Subsidy): কোনো পণ্য বা সেবার মূল্য কম রাখতে বা উৎপাদন উৎসাহিত করতে সরকার প্রদত্ত আর্থিক সহায়তা।
  17. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (Foreign Exchange Reserve): কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংরক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রা, যা আন্তর্জাতিক লেনদেন ও আমদানি ব্যয় পরিশোধে ব্যবহৃত হয়।
  18. প্রত্যক্ষ কর (Direct Tax): যে কর সরাসরি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয় বা সম্পদের ওপর আরোপিত হয়, যেমন—আয়কর।
  19. পরোক্ষ কর (Indirect Tax): যে কর পণ্য বা সেবার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আদায় করা হয়, যেমন—ভ্যাট ও শুল্ক।
  20. উন্নয়ন ব্যয় (Development Expenditure): অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারের ব্যয়।
  21. পরিচালন ব্যয় (Operating Expenditure): সরকারি প্রশাসন পরিচালনা, বেতন-ভাতা, পেনশন, ভর্তুকি ও ঋণের সুদ পরিশোধসহ নিয়মিত ব্যয়।
  22. মুদ্রানীতি (Monetary Policy): অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ, সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গৃহীত নীতি।
  23. রাজস্বনীতি (Fiscal Policy): কর, সরকারি ব্যয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থনীতি পরিচালনার জন্য সরকারের গৃহীত নীতি।
  24. মাথাপিছু আয় (Per Capita Income): একটি দেশের মোট জাতীয় আয়কে (GNI) মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যে গড় আয় পাওয়া যায় তাকে মাথাপিছু আয় বলা হয়। এটি একটি দেশের মানুষের গড় আয়ের ধারণা দেয়। বাংলাদেশের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী মাথাপিছু আয় ৩,০২০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩,৬৮,৮৭৩ টাকা)
  25. রাজস্ব উদ্বৃত্ত (Revenue Surplus): সরকারের মোট রাজস্ব আয় রাজস্ব ব্যয়ের চেয়ে বেশি হলে যে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে তাকে রাজস্ব উদ্বৃত্ত বলা হয়।
  26. অর্থনৈতিক মন্দা (Economic Recession): যখন একটি দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে কমে যায়, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হ্রাস পায় এবং প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তখন তাকে অর্থনৈতিক মন্দা বলা হয়।
  27. বৈদেশিক ঋণ (Foreign Loan): বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান যে ঋণ গ্রহণ করে তাকে বৈদেশিক ঋণ বলা হয়।
  28. বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (Foreign Direct Investment–FDI): কোনো বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন অন্য একটি দেশে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা উৎপাদন খাতে মূলধন বিনিয়োগ করে এবং সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করে, তাকে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই (FDI) বলা হয়।
  29. মুদ্রানীতি (Monetary Policy): অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ঋণপ্রবাহ ও অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতিমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে, তাকে মুদ্রানীতি (Monetary Policy) বলা হয়। এই নীতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার, নীতিগত সুদহার, নগদ জমা সংরক্ষণ (CRR), সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (SLR) এবং অন্যান্য আর্থিক উপকরণ ব্যবহার করে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে।

তথ্যসূত্র 

  • অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ
  • বাজেট বক্তৃতা ২০২৬–২০২৭
  • ফাইন্যান্স অ্যাক্ট ২০২৬
  • বাংলাদেশ ব্যাংক
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)
  • বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)


No comments: