Friday, March 9, 2018

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র


রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র

বাগেরহাট জেলার রামপালে নির্মিত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র যা পশুর নদীর তীরে অবস্থিত।রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবন থেকে ১৪ কি.মি দূরে এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান থেকে ৭০ কি.মি.দূরে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মানে প্রধান দেশ হিসেবে সহায়তা করেছে ভারত। প্রকল্পটির নাম মূল নাম মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্টবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মানের জন্য ভারতের হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড এর সাথে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের একটি চুক্তি হয়।প্রকল্পটির মালিক প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (BIFPCL), যা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং ভারতের NTPC Limited-এর যৌথ প্রতিষ্ঠান।রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১০ সালে। মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। প্রথম ইউনিট ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতা নিয়ে ২০২২ সালে উৎপাদনে আসে এবং দ্বিতীয় ইউনিট চালুর মাধ্যমে ২০২৩ সালে কেন্দ্রটি পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতায় পৌঁছে।রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১,৩২০ মেগাওয়াট (MW)। এখানে দুটি ইউনিট রয়েছে, প্রতিটির ক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটি আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত হয়, যার মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কম জ্বালানি ব্যবহার করে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা করা হয়। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে সুন্দরবনের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এ কারণে কেন্দ্রটিতে দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের জন্য ইউনেস্কো বাংলাদেশকে ১৪টি শর্ত দিয়েছিল। শর্ত গুলো হলো-

১. সুন্দরবনের ওপর প্রকল্পের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে।
২. একটি পূর্ণাঙ্গ Strategic Environmental Assessment (SEA) করতে হবে।
৩. সুন্দরবনের Outstanding Universal Value (OUV) বা বিশ্ব ঐতিহ্যগত মূল্য যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. নতুন শিল্প প্রকল্পের সমষ্টিগত প্রভাব (cumulative impact) বিশ্লেষণ করতে হবে।
৫. কয়লা পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৬. ছাই (fly ash ও bottom ash) ব্যবস্থাপনা নিরাপদ করতে হবে।
৭. দূষিত পানি নদীতে ছাড়ার আগে পরিশোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. পশুর নদীর পানি, জীববৈচিত্র্য ও জলজ প্রাণী রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।
৯. কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচলের কারণে সুন্দরবনের ওপর প্রভাব কমাতে হবে।
১০. নদী খনন (dredging) ও নৌ চলাচলের পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
১১. তেল, রাসায়নিক বা কয়লা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় জরুরি পরিকল্পনা থাকতে হবে।
১২. সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে ডলফিন, বাঘ ও অন্যান্য প্রাণীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
১৩. পরিবেশ পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে।
১৪. ভবিষ্যৎ শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে সুন্দরবন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

রামপাল কেন্দ্রে সাধারণত বিটুমিনাস (Bituminous) কয়লা ব্যবহার করা হয়। এই কয়লা মূলত ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎস থেকে আমদানি করা হয়।

সাধারণত এই ধরনের কয়লার বৈশিষ্ট্য হলো—

  • তাপ উৎপাদন ক্ষমতা (Calorific Value) বেশি, ফলে কম কয়লায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।
  • সালফারের পরিমাণ তুলনামূলক কম রাখা হয়, যাতে সালফার ডাই-অক্সাইড (SO₂) দূষণ কম হয়।
  • ছাইয়ের পরিমাণ (Ash content) নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়, যাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হয়।
  • কয়লার মান পরীক্ষা করে (যেমন আর্দ্রতা, সালফার, ছাই, তাপমান) বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপযোগী কয়লা গ্রহণ করা হয়।
কেন্দ্রের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য Flue Gas Desulfurization (FGD), **Electrostatic Precipitator (ESP)**সহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গত দূষণ কমানো যায়।

দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ, শিল্পায়ন বৃদ্ধি এবং জাতীয় গ্রিডকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে কেন্দ্রটি নিয়মিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রটি মাসে ৬০০–৭৬০ মিলিয়ন ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এটি প্রায় ৭৬০ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যা দেশের মোট উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল।

No comments: